Spread the love

বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী অবিবাহিতদের প্রজনন স্বাস্থ্য সবসময় বিতর্কিত এবং নিষিদ্ধ । বাস্তবিক ভাবে প্রজনন স্বাস্থ্য বলতে কি বোঝায় তা নিয়ে আমাদের কোন স্পষ্ট ধারণা নেই , এর উপযোগিতা সম্পর্কে কতখানি ধারণা আছে সেই প্রশ্ন অবান্তর । প্রজনন স্বাস্থ্য বলতে আমরা শুধু মাত্র যৌনতা ও যৌন জীবন বুঝি । কিন্তু এর বাইরেও প্রজনন স্বাস্থ্যের পরিধি অনেক  বিশাল । প্রজনন অঙ্গের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা , রোগ ও রোগ সম্পর্কিত জটিলতা এবং তা নির্নয় , মাতৃ স্বাস্থ্য ও প্রসব সেবা , পরিবার পরিকল্পনা সব কিছু  মিলিয়ে   যে শিক্ষা তা   প্রজনন স্বাস্থ্যের অংশ ।  একজন মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার  উপর তার পরবর্তী প্রজন্ম অনেক খানি নির্ভরর্শীল ।

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে কম বেশি সবাইকে যে অত্যন্ত গোপনীয় সমস্যা এবং প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় সেটি হল “ আমার প্রেমিকা / আমি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে থাকাকালীন সময়ে গর্ভবতী , এখন কি করতে পারি ? “ গর্ভবতী হবার পর অনেকে লোক লজ্জার ভয়ে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে না গিয়ে হয়তো নিজেই বাজার থেকে গর্ভপাতের ওষুধ কিনে খান অথবা হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, যার ফলাফল খুব ভয়ঙ্কর ,বন্ধ্যাত্ব থেকে মৃত্যু ।

এধরণের সমস্যার সমাধান প্রতিনিয়িত দিতে গিয়ে একসময় নিজের মনের কাছেই প্রশ্ন রেখেছি , বারবার সবাই নেড়া হতে বেলতলায় কেন যায় ? আবেগে নাকি জ্ঞানের অভাবে ?! আবেগ মানব জীবনের অনেক বড় একটি অংশ যা আমরা কখনই বর্জন করতে পারব না । যা করা সম্ভব সেটা হল মানুষকে সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য দিয়ে ওয়াকিবহাল করা । আবেগ মানুষকে যেমন দূর্বল করে দিতে পারে ,ঠিক  তেমনি  ভাবেই সঠিক জ্ঞান এর প্রয়োগ এবং  ক্ষমতায়ন করে , অনেক অপৃতীতিকর পরিস্থিতিকে  এড়িয়ে যাবার  শক্তি যোগায় ।

শিক্ষার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়না কখনোই। তাই সুস্থভাবে বাচতে হলে জানতে হবে। তাই ব্যাবহারিক শিক্ষা  ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি , নন-ফরমাল মেথডের যে কোন  শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, তা বিগত স্বাস্থ্য খাতের বৈপ্লবিক পরিবর্নের ইতিহাস ঘাটলেই পাওয়া যাবে । কলেজ এবং বিশ্ব-বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রেসক্রিপশন বাংলাদেশ  এর মতন প্ল্যাটফর্ম তৈরী করা যেতে পারে। রক্ষণশীল গ্রামের যুব সমাজের জন্য কিছু প্রজেক্টে আলাদা আলাদা ভাবে  নারী-পুরুষ মাঠকর্মী নিয়োগ দেয়া যেতে পারে, যারা গ্রামে প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করবে এবং মিথ বাস্টার ও স্টিগমা ব্রেকার হিসেবে কাজ করবে। ধর্মীয় নেতাদের অ্যাডভোকেসি করতে হবে। গ্রামের সাথে সাথে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য একই পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে।

সর্বস্তরের  সেবা প্রদান উন্মুক্ত করার পূর্বে অনেকগুলো ধাপ আছে। শিক্ষা ও জন-সচেতনতা, অ্যাডভোকেসি, পলিসি অন্তর্ভুক্ত করণ, সেবা প্রদান কেন্দ্র স্থাপন অথবা পুনর্গঠন করা। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বিবাহিত-অবিবাহিত সবার জন্য প্রজনন স্বাস্থ্য সেবাকে পলিসির অন্তর্ভূক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত সম্মিলিত স্বাস্থ্য সেবা থেকে পিছিয়ে থাকব ।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য  সম্পর্কিত তথ্য এবং পরিসেবা গুলো সবার জন্য উন্মুক্ত হতে হবে যাতে করে সবাই খুব সহজেই তথ্য এবং সেবা পেয়ে যান । এতে করে এই  সার্বজনীন শিক্ষা  বৈষম্য ছাড়াই  সবাইকে সেবা প্রদান করতে পারবে । দেশের সকল নাগরিকের নাগরিকত্ব, বয়স, বৈবাহিক বা অবৈবাহিক অবস্থা,জাতি ,ধর্ম, গোত্র ,বর্ন নির্বিশেষে সবার জন্য Sexual and Reproductive Health and Rights (SRHR) সম্পর্কিত তথ্য এবং সেবা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। সবার নিজেদের শরীর সম্পর্কে জানা উচিত ,  অধিকার সম্পর্কে  জানা উচিত এবং  সেই  অধিকার প্রয়োগ করার ক্ষমতা থাকা এখন সময়ের দাবি ।

আমার দৃষ্টিভঙ্গি এবং মতামত  হল ,যে সমস্ত অল্প বয়সী মেয়ে এবং ছেলেদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সঠিক তথ্যে্র ইন্টারনেটে  প্রবেশাধিকার করারা সুযোগ এবং সামর্থ  রয়েছে , যেসব তরুন -তরুনী, কিশোর-কিশোরী  বা যুবক-যুবতীরা ইন্টারনেট থেকে জেনে নিতে পারে এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পারে। কিন্তু অনেক সময় তাদের সমবয়সীদের কাছ থেকে বা তাদের বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য  ভুল হতে পারে। তাই পরিবার এবং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে এগিয়ে আসতে হবে।  ভবিষ্যতের তরুণদের সঠিক তথ্য সরবরাহ করার দায়িত্ব পরিবার এবং  সরকারেরর উপরও পড়ে।

 

Dr. Abu Sayed Hasan,

Program Specialist-SRH,

Sexual and Reproductive Health, UNFPA BANGLADESH.